রাতের শেষ প্রহর, জানালার ফাঁক গলে আসা নরম আলোতে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটা ছোট্ট ছায়া। রিমি ঘুম ভাঙতেই দেখে, তার আদরের বিড়াল “মেও” ইতোমধ্যে ব্যাগের ওপর বসে আছে। যেন বোঝাতে চাইছে, “চলো, এবার বের হও!” আজ যে তারা প্রথমবার একসঙ্গে লম্বা সফরে বেরোবে!
কিন্তু রিমি জানে, বিড়ালের সাথে ভ্রমণ মোটেও সহজ কাজ নয়। সে একটু চিন্তিত—মেও কি নতুন পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে? রাস্তায় গিয়ে অস্থির হবে না তো? খাবার-লিটার বক্স সব ঠিকঠাক গোছানো হয়েছে তো?
এই ভাবনাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকলেও, রিমি নিশ্চিত সে মেও-র জন্য সেরা প্রস্তুতিটাই নিয়েছে। সে তার ব্যাগ খুলে দেখে—মেও-র পছন্দের খেলনা, ছোট্ট কম্বল, পানির বোতল, এমনকি নিজের পুরোনো একটা টি-শার্টও রেখেছে, যাতে মেও তার গন্ধ পেয়ে স্বস্তি পায়।
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার মুহূর্তে মেও ক্যারিয়ারের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট মিউ মিউ করে ডাকল। রিমি হেসে বলে উঠল, “চলো বন্ধু, আজ আমাদের একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চার শুরু হতে যাচ্ছে!”
একবার ভাবুন তো, আপনি আর আপনার আদরের বিড়ালছানা মিলে লং ড্রাইভে যাচ্ছেন, অথবা প্লেনে করে উড়াল দিচ্ছেন নতুন কোনো শহরে! দারুণ একটা ছবি, তাই না? কিন্তু বিড়ালকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করাটা সবসময় সহজ নয়।
কিছু প্রস্তুতি আর সতর্কতা অবলম্বন করলে আপনার বিড়ালছানার ভ্রমণ নিরাপদ এবং আনন্দদায়ক হতে পারে। তাই, বিড়ালকে সাথে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আগে কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে, চলুন জেনে নেওয়া যাক!
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ করার প্রস্তুতি
বিড়ালকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করার আগে কিছু প্রস্তুতি নিলে যাত্রা সহজ হয়ে যায়। আপনার বিড়ালকে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে, তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানো এবং উপযুক্ত পরিবহন নির্বাচন করা পর্যন্ত সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
বিড়ালকে ভ্রমণের জন্য প্রস্তুত করা
বিড়ালকে ভ্রমণের জন্য অভ্যস্ত করতে ধীরে ধীরে শুরু করুন। প্রথমেই তাকে ক্যারিয়ার ব্যাগ বা ভ্রমণের পরিবেশের সাথে পরিচিত করতে হবে। ক্যারিয়ারটি বাসায় রেখে তার ভেতরে একটি পরিচিত কম্বল বা খেলনা রাখুন, যাতে সে এটাকে নিরাপদ জায়গা মনে করে। এরপর অল্প সময়ের জন্য বিড়ালকে ক্যারিয়ার ব্যাগে খেতে দিন।
তারপর ধীরে ধীরে তাকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে ছোট ছোট ট্রিপে নিয়ে যান, যেমন বাড়ির আশেপাশে গাড়িতে ঘুরে আসা। এভাবে ভ্রমণের সময় বাড়াতে থাকুন, যাতে বিড়াল গাড়িতে চড়ে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
বিড়ালকে নিয়ে নিরাপদে ভ্রমণের জন্য সাথে কি কি নিতে হয়
বিড়ালের ভ্রমণের সময় তার নিরাপত্তা এবং আরামের জন্য কিছু জিনিস সাথে রাখা জরুরি। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
১) খাবার ও পানি সাথে পাত্র রাখুন। বিড়ালের জন্য কিছু খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখুন। বহনযোগ্য Dry Food ও পানির বোতল নিন।
২) যদিও বিড়াল ভ্রমণের সময় পটি বা পি করে না তবুও যদি বিড়ালের প্রাকৃতিক কাজের প্রয়োজন হয় বা জার্নি অনেক বেশি দীর্ঘ (১০ ঘণ্টার কাছাকাছি হয়) তাহলে Portable Litter Box ও কিছু পরিমাণ লিটার সাথে রাখুন।
৩) অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনার জন্য কিছু পরিষ্কার করার সরঞ্জাম, যেমন – পেপার টাওয়েল, ডিসইনফেকটেন্ট সাথে রাখুন।
৪) যদি কোথাও বেড়াতে গিয়ে থাকেন তবে বিড়ালের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, যেমন – অ্যান্টিসেপটিক, ব্যথানাশক নিয়ে যেতে পারেন। তবে এটা অপশনাল, না নিলে ভ্রমণে অসুবিধা হবে না।
৫) বিড়ালের গলায় আইডি ট্যাগ সহীত Cat Collar পরিয়ে দিন, যেখানে আপনার ফোন নম্বর ও ঠিকানা লেখা থাকবে। এতে করে যদি বিড়াল হারিয়ে যায় তবে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
৬) আপনার একটি পুরোনো টি-শার্ট নিন, যেটা আপনার গন্ধ বহন করে। এবং সেটি Cat Carrier এর ভেতর রাখুন। এটা বিড়ালকে মানসিক ভাবে শান্ত রাখতে সহায়তা করবে।
ভ্রমণের জন্য বিড়ালের ক্যারিয়ার ব্যাগ
একটি মজবুত ও আরামদায়ক ক্যারিয়ার ব্যাগ ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যারিয়ারটি যেন ভালোভাবে বায়ু চলাচল করে এবং বিড়ালের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে। ভেতরে নরম কাপড় বা প্যাড রাখুন।
হার্ড-সাইড ও সফট-সাইড – দুই ধরনের ক্যারিয়ার ব্যাগ পাওয়া যায়। আপনার বিড়ালের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি বেছে নিন। প্রায় সব ধরনের Cat Carrier Bag PriyoPets এ পেয়ে যাবেন খুব সাশ্রয়ী মূল্যে।
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ করার জন্য সঠিক পরিবহন বাছাই
বিড়ালের সাথে ভ্রমণের জন্য সঠিক পরিবহন নির্বাচন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাস, ট্রেন, প্লেন অথবা গাড়ি – বিভিন্ন মাধ্যমে ভ্রমণের জন্য কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এবার চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক পরিবহন ভেদে বিড়ালের সুবিধা অসুবিধা।
পরিবহন মাধ্যম | সুবিধা | অসুবিধা |
গাড়ি | নিজের সুবিধা অনুযায়ী বিরতি নেওয়া যায় | লম্বা যাত্রায় বিড়াল বিরক্ত হতে পারে |
ট্রেন | কিছু ট্রেনে বিড়াল নেওয়ার ব্যবস্থা আছে | সব ট্রেনে এই সুবিধা নাও থাকতে পারে |
প্লেন | দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায় | বিড়ালের জন্য মানসিক চাপের হতে পারে |
ভ্রমণের সময় বিড়ালের যত্ন / পরিচর্চা
ভ্রমণের সময় বিড়ালের সঠিক যত্ন নেওয়াটা খুব জরুরি। প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পর বিড়ালকে অল্প পরিমাণে খাবার ও জল দিন। নিয়মিত বিরতিতে লিটার বক্স ব্যবহার করতে দিন, যাতে সে স্বস্তি বোধ করে। বিড়ালকে আদর করুন এবং তার সাথে কথা বলুন, যাতে সে ভয় না পায়। তার প্রিয় খেলনা দিয়ে কিছুক্ষণ খেলুন, এতে সে আনন্দিত থাকবে। মূলত এই বিষয় গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
ভ্রমণে বিড়ালকে শান্ত করার উপায
কিছু বিড়াল ভ্রমণের সময় খুব অস্থির হয়ে যায়। তাদের শান্ত রাখতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন: বিড়ালের জন্য ফেরোমন স্প্রে ব্যবহার করুন, যা তাদের শান্ত করতে সাহায্য করে।
তাছাড়া গাড়িতে বা প্লেনে তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখুন এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করুন, বাস কিংবা ট্রেন হলে জানার পাশে রাখুন যেনো হাল্কা বাতাস লাগে।
বিড়ালের পরিচিত গন্ধযুক্ত কাপড় বা খেলনা সাথে রাখুন, যা তাকে মানসিক শান্তি দেবে। তবে বেশি অস্থির হলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে যা জানা জরুরি
ভ্রমণের সময় বিড়াল কিভাবে বাথরুমে যায়?
বিড়াল সাধারণত লিটার বক্সে বাথরুমে যায়। বিড়ালের জন্য ভ্রমণের সময় পোর্টেবল লিটার বক্স ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। এটি সহজে বহন করা যায় এবং বিড়াল প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারে।
তাই ভ্রমণে একটি ছোট পোর্টেবল লিটার বক্স গাড়ি থামার সময় ক্যারিয়ারের দরজা খুলে লিটার বক্সটি তার সামনে রাখুন। বিড়ালরা পরিচিত গন্ধে অভ্যস্ত, তাই বাসার লিটার ব্যবহার করা ভালো। তবে লিটার বক্স ব্যবহারের পর তা ভালোভাবে পরিষ্কার করুন, যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায়।
NOTE: যেমনটা আগেও বলেছি বিড়াল স্বাভাবিক ভাবে ভ্রমণের সময় পটি বা পি করতে চায় না। জার্নি যদি অল্প সময়ের হয় তবে এই ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই।
বিড়ালের ভ্রমণে কি চাপ লাগে?
হ্যাঁ, বিড়ালের জন্য ভ্রমণ চাপের হতে পারে। তারা পরিবর্তন পছন্দ করে না, তাই নতুন পরিবেশ, শব্দ এবং গন্ধ বিড়ালকে উদ্বিগ্ন করে। চাপের লক্ষণ হতে পারে অতিরিক্ত মিয়াও করা, কাঁপা বা খাওয়া বন্ধ করা। তবে সঠিক প্রস্তুতি দিয়ে এই চাপ কমানো সম্ভব।
ভ্রমণের আগে কখন বিড়ালকে খাওয়ানো বন্ধ করা উচিত?
ভ্রমণের ২-৩ ঘণ্টা আগে বিড়ালকে খাওয়ানো বন্ধ করা ভালো। এতে বমি বা মোশন সিকনেসের ঝুঁকি কমে। তবে পানি দেওয়া চালিয়ে যান, যাতে সে ডিহাইড্রেটেড না হয়। কিন্তু যাত্রা চলা কালীন সময় কিছু Dry Food রাখা উচিৎ, বিশেষ করে যখন জার্নির সময় অনেক বেশি হবে।
বিড়াল কি ৬ ঘন্টা না খেয়ে থাকতে পারে?
সাধারণত, একটি সুস্থ বিড়াল ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে পারে। তবে, ছোট বিড়ালছানা বা অসুস্থ বিড়ালের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। লম্বা যাত্রায় প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পর বিড়ালকে অল্প পরিমাণে খাবার বা ট্রিট দিন।
গাড়িতে বিড়ালের নিরাপদ স্থান কোথায়?
গাড়িতে বিড়ালের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো ক্যারিয়ার ব্যাগ। আর গাড়িতে বিড়ালের ক্যারিয়ারে রাখা উচিৎ পিছনের সিটে। সিট বেল্ট দিয়ে ক্যারিয়ারটি সুরক্ষিত করুন। সামনের সিটে এয়ারব্যাগের ঝুঁকি থাকায় তাকে সেখানে না রাখাই ভালো। কেননা, দুর্ঘটনার সময় এয়ারব্যাগ খুললে বিড়াল আহত হতে পারে।
বিড়াল ভ্রমণ করতে পছন্দ করে না কেন?
বিড়াল সাধারণত তাদের চেনা পরিবেশ এবং রুটিন পছন্দ করে। ভ্রমণের সময় এই রুটিনে পরিবর্তন আসায় তারা অপছন্দ করে। কেননা, বিড়ালরা তাদের পরিচিত এলাকা ছেড়ে যেতে ভয় পায়। গাড়ির শব্দ, গতি এবং নতুন পরিবেশ তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। তবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করলে তারা ভ্রমণে মানিয়ে নিতে পারে।
বিড়ালকে কি সামনের সিটে বসানো যায়?
না, বিড়ালকে সামনের সিটে বসানো উচিত নয়। এয়ারব্যাগ ও দ্রুত ব্রেকের ঝুঁকি থাকে। পিছনের সিটে ক্যারিয়ারে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ। তাছাড়া বিড়াল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করে, বিড়ালকে সামনের সিটে রাখলে সে চালকের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারে, যা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ করা কতটা কঠিন?
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ কঠিন হতে পারে যদি প্রস্তুতি না থাকে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার ও যত্নের মাধ্যমে এটি সহজ করা যায়। বিড়ালের স্বভাব ও ভ্রমণের দৈর্ঘ্যের ওপরও এটি নির্ভর করে।
বিড়াল সাধারণত কত ঘন্টা ভ্রমণ সহ্য করতে পারে?
সুস্থ বিড়াল সাধারণত ৬-৮ ঘণ্টা ভ্রমণ সহ্য করতে পারে, যদি তাদের পানি, লিটার বক্স ও আরাম দেওয়া হয়। তবে, এটি বিড়ালের বয়স, স্বাস্থ্য এবং অভ্যাসের উপর নির্ভর করে। কম বয়সী এবং অসুস্থ বিড়ালদের জন্য কম সময় ভ্রমণ করা ভালো। আবার যে বিড়াল আগে থেকে ভ্রমণে অভ্যস্ত, সে বেশি সময় ধরে ভ্রমণ করতে পারে। তাই লম্বা যাত্রায় প্রতি ৪-৫ ঘণ্টা পর পর বিরতি নিন এবং বিড়ালকে বিশ্রাম দিন।
চূড়ান্ত মন্তব্য
বিড়ালের সাথে ভ্রমণ একটি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা, যদি আপনি সঠিক প্রস্তুতি নেন এবং জরুরি বিষয় গুলো মনে রাখেন। আপনার বিড়ালকে ভ্রমণের জন্য অভ্যস্ত করা, সঠিক পরিবহন নির্বাচন করা, এবং যাত্রাপথে তার যত্ন নেওয়া – এই সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, প্রতিটি বিড়াল আলাদা, তাই তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন।