রাতের বেলা, রিমি তার আদরের বিড়াল “মিনি”-কে খাবার দিতে গেল। প্রতিদিনের মতোই মিনি দৌড়ে এসে খেতে বসলো, কিন্তু আজ কিছু একটা ঠিক নেই। মিনি বারবার খাবার মুখে নিচ্ছে, কিন্তু খেতে পারছে না। কিছুক্ষণ পর হাল ছেড়ে দিয়ে করুণ চোখে রিমির দিকে তাকিয়ে রইলো। উদ্বিগ্ন হয়ে রিমি তার মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই দেখলো, মুখের এক পাশে ছোট্ট একটা লালচে ঘা।
রিমি প্রথমে ভাবলো, হয়তো এটা কিছুই না, কয়েকদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরদিন দেখা গেল, মিনি একদমই খেতে পারছে না, লালা পড়ছে, আর মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। তখনই সে বুঝতে পারলো, এটা কোনো সাধারণ সমস্যা নয়। বিড়ালের মুখে ঘা হলে করণীয় সম্পর্কে জানা জরুরি, না হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
অনেক পোষা প্রাণীর মালিকের মতো, রিমিও বুঝতে পারছিল না কী করা উচিত। গুগলে সার্চ করতে গিয়ে সে দেখলো, বিড়ালের মুখের ঘা নানা কারণে হতে পারে—ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, দাঁতের সমস্যা কিংবা অপুষ্টির কারণে। ঘরোয়া সমাধান কী? চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার কি? কোন খাবার খাওয়ানো যাবে?
বিমির মতই প্রতিটা বিড়াল প্রেমী তার বিড়ালের এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়। আপনার বিড়াল যদি এমন সমস্যায় পড়ে, তাহলে কী করবেন? বিড়ালের মুখে ঘা হলে করণীয় কী? এই আর্টিকেলে আমরা সেই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানাবো, যাতে আপনার আদরের বিড়াল সুস্থ থাকতে পারে।
বিড়ালের মুখে ঘা কেন হয়?
বিড়ালের মুখে ঘা হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। কারণ গুলো জানা থাকলে আগে থেকেই সতর্ক থাকা যায় এবং বিড়ালকে সুস্থ রাখা সহজ হয়। নিচে কয়েকটি প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো:
- ভাইরাস সংক্রমণ
ক্যালিসিভাইরাস (Calicivirus) বিড়ালের মধ্যে খুবই পরিচিত একটি ভাইরাস, যা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং মুখের ঘা সৃষ্টি করে। এই ভাইরাসের কারণে জিভে, মাড়িতে ও তালুতে ছোট ছোট ফোস্কা দেখা যায়, যা পরবর্তীতে ঘায়ে পরিণত হয়।
হার্পিস ভাইরাস (Herpesvirus) ভাইরাসও শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ করে এবং মুখের ঘা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট বিড়ালছানা এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয়।
- ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ
নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করালে বিড়ালের মুখে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে। দাঁতের চারপাশে খাদ্যকণা জমে প্ল্যাক তৈরি হয়, যা থেকে জিঞ্জিভাইটিস (gingivitis) এবং পিরিওডন্টাইটিস (periodontitis) এর মতো রোগ হতে পারে। এগুলো মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে ঘায়ে পরিণত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, শরীরে প্রবেশ করা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও মুখে ঘা সৃষ্টি করতে পারে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা
যদি কোনো বিড়ালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, তাহলে তাদের মুখে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে শরীর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়তে পারে না, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
- অ্যালার্জি ও সংবেদনশীলতা
কিছু বিড়ালের বিশেষ কিছু খাবারে অ্যালার্জি থাকতে পারে, যা মুখের আশেপাশে জ্বালা সৃষ্টি করে এবং ঘা তৈরি করে।
- শারীরিক আঘাত
অনেক সময় বিড়াল ধারালো কিছু খেলে বা কোনো শক্ত জিনিস কামড়ালে মুখে আঘাত পেতে পারে। এই আঘাতের কারণে প্রথমে ছোটখাটো ক্ষত তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে সংক্রমিত হয়ে ঘায়ে পরিণত হয়।
- রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ
বিড়াল যদি কোনো বিষাক্ত বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ চেটে খায়, তাহলে তার মুখে ঘা হতে পারে। যেমন, পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট বা কীটনাশক।
বিড়ালের মুখের ইনফেকশন হলে কিভাবে বুঝবো?
বিড়ালের মুখের ঘা শনাক্ত করতে কিছু লক্ষণ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ উল্লেখ করা হলো, যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার বিড়ালের মুখে সংক্রমণ হয়েছে কিনা:
১) মুখের দুর্গন্ধ: মুখের সংক্রমণ হলে বিড়ালের মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। এটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং টিস্যু ক্ষয়ের কারণে হয়ে থাকে।
২) অতিরিক্ত লালা ঝরা: সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে বিড়ালের মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা ঝরতে পারে।
৩) খাবার খেতে অসুবিধা: বিড়ালের মুখে ঘা বা সংক্রমণ হলে তাদের খাবার গিলতে বা চিবোতে কষ্ট হতে পারে। এর ফলে তারা খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।
৪) ওজন কমে যাওয়া: যদি বিড়ালের খাবার গ্রহণে অসুবিধা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে তার ওজন কমতে শুরু করবে।
৫) মাড়ি থেকে রক্তপাত: মাড়িতে সংক্রমণ হলে দাঁত ব্রাশ করার সময় বা এমনিতেও রক্তপাত হতে পারে। মাড়ি লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে।
৬) মুখ ঘষাঘষি করা: বিড়াল যদি তার মুখ মেঝেতে বা কোনো আসবাবপত্রে ঘষে, তাহলে বুঝতে হবে তার মুখে অস্বস্তি হচ্ছে।
৭) মেজাজ পরিবর্তন: মুখের ব্যথার কারণে বিড়ালের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুপচাপ থাকতে পারে বা বিরক্ত হতে পারে।
বিড়ালের মুখে কি ঠান্ডা ঘা হতে পারে?
মানুষের মতো বিড়ালেরও ঠান্ডা ঘা হতে পারে, তবে এর কারণ ভিন্ন। মানুষের ঠান্ডা ঘা সাধারণত হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (Herpes Simplex Virus) দ্বারা হয়ে থাকে, কিন্তু বিড়ালের ক্ষেত্রে ক্যালিসিভাইরাস (Feline Calicivirus) এবং হার্পিস ভাইরাস (Feline Herpesvirus) দায়ী। এই ভাইরাস বিড়ালের শ্বাসযন্ত্র এবং মুখের মধ্যে সংক্রমণ ঘটায়, যা থেকে ঠান্ডা ঘা বা ফোস্কার মতো উপসর্গ দেখা যায়।
বিড়ালের মুখে ঘা হলে করণীয়
বিড়ালের জিহ্বায় ঘা হলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে সংক্রমণ বাড়তে না পারে এবং বিড়াল দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। নিচে কিছু জরুরি করণীয় আলোচনা করা হলো:
প্রাথমিক চিকিৎসা
একটি নরম কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে বিড়ালের মুখ মুছে দিন। এতে ঘা এর এলাকা পরিষ্কার থাকবে এবং সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা কমবে।
এরপর বিড়ালের মুখ পরীক্ষা করে ঘা এর কারণ নির্ণয় করতে হবে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, বা অন্য কোনো কারণে ঘা হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখা জরুরি।
রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভাইরাল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল বা অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ দিতে হবে। এছাড়াও, ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে বিড়ালের কষ্ট কমানো যায়।
খাবার ও পানীয় প্রদান
ঘা সেরে না যাওয়া পর্যন্ত বিড়ালকে নরম খাবার দিন, যা গিলতে সহজ হয়। শুকনো খাবার এড়িয়ে চলুন, কারণ তা ঘায়ের সংস্পর্শে এসে ব্যথা বাড়াতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে কার্যকর PriyoPet এর ভেজা Cat Food গুলো।
খাবার যদি একেবারে গিলতে না পারে, তাহলে তরল খাবার যেমন স্যুপ করে দিন। তাছাড়া বিড়ালকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করানো জরুরি। ডিহাইড্রেশন (Dehydration) এড়ানোর জন্য সবসময় পরিষ্কার পানি হাতের কাছে রাখুন।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
বিড়ালের খাবার ও পানির পাত্র প্রতিদিন গরম পানি ও সাবান দিয়ে পরিষ্কার করুন। এটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বিড়ালের বিছানা এবং খেলার জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করুন, যাতে সেখানে কোনো জীবাণু না থাকে।
বিড়ালের মুখের ঘা এর চিকিৎসা?
প্রাথমিক ও ব্যাসিক চিকিৎসায় যদি ঘা ভালো না হয় তবে নিচে কয়েকটি চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন:
ভাইরাল সংক্রমণ: যদি ঘা কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিতে পারেন। এছাড়া, বিড়ালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সাপ্লিমেন্ট (Supplement) দেওয়া হয়।
ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ: ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ওষুধ সঠিক ডোজে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়াতে হয় যা একজন Vet ই ভালো জানাতে পারবে। আপনি যদি সরাসরি Vet এর কাছে না যেতে পারেন তবে PriyoPets এর Online Vet এর সাথে পরামর্শ করুন।
অ্যালার্জি: যদি কোনো খাবারের কারণে অ্যালার্জি হয়ে থাকে, তাহলে সেই খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এবং ঘা এর জায়গায় অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন (antiseptic solution) দিয়ে পরিষ্কার রাখতে হয়। এটি সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে এবং দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করবে। সর্বোপরি, একজন ভালো Vet এর সাথে যোগাযোগ করা জরুরি।
বিড়ালের মুখে ঘা হলে কি খাওয়ানো যায়?
বিড়ালের মুখে ঘা হলে তাদের খাবার বাছাই করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমন খাবার দিতে হবে যা নরম এবং সহজে গেলা যায়, যাতে ঘায়ে কোনো প্রকার চাপ না পড়ে।
মুখের ঘা হলে বিড়ালের খাবার যা হবে:
১) উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার: যেহেতু বিড়াল কম খাবার খেতে পারে, তাই খাবারের মধ্যে যেন পর্যাপ্ত ক্যালোরি থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
২) ভিটামিন ও মিনারেল: ভিটামিন বি, সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার বিড়ালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৩) ছোট এবং নরম খাবার: বিড়ালকে ছোট ছোট এবং নরম খাবার দিন, যা চিবানো এবং গেলা সহজ হয়। খাবার বাছাই করার বেস্ট চয়েজ PriyoPets এর Cat Foods.
উপসংহার
আশা করি উক্ত আর্টিকেল দ্বারা বিড়ালের মুখে ঘা হলে করণীয় কি হবে সেটি জানতে পেরেছেন। বিড়ালের মুখে ঘা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই, একজন দায়িত্ববান মালিক হিসেবে আপনার উচিত বিড়ালের মুখের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
আপনার একটুখানি যত্নেই আপনার প্রিয় বিড়ালটি সুস্থ ও হাসি-খুশি থাকতে পারে। আপনার বিড়ালের সুস্থতা নিশ্চিত করতে, আজই আপনার পশুচিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।